যত ঝুঁকির কারণ হোক না কেন আমি কখনো হিজাব খুলবো না: ইন্দোনেশিয়ার অন্ধ ক্রীড়াবিদ

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় চলমান এশিয়ান প্যারা (Asian Para) গেমসে অংশগ্রহণকারী দেশটির একজন অন্ধ ক্রীড়াবিদ তার হিজাব খুলতে অস্বীকার করায় প্রতিযোগিতায় তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

মিফতাহুল জান্নাহ নামের ওই অন্ধ ক্রীড়াবিদকে চলতি মাসের ৭ তারিখ অযোগ্য ঘোষণা করার পর পরেই ইন্দোনেশিয়ার জনগণ তার প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। ২১ বছর বয়সী অন্ধ হিজাবী

ক্রীড়াবিদ যখন জুড়ো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য মাঠে নেমেছিলেন তখন খেলা পরিচালনাকারী রেফারি তাকে তার হিজাব খুলে ফেলতে আহ্বান জানান।

কিন্তু মিফতাহুল জান্নাহ তার হিজাব খুলতে অস্বীকার করায় রেফারি একদিন পূর্বে জুড়ো প্রতিযোগিতায় হিজাব নিষিদ্ধ করার হয়েছে বলে জানিয়ে তাকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেন।

এর পরেই অন্ধ এই ক্রীড়াবিদ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ইন্দোনেশিয়ার সোশ্যাল মিডিয়ায় মিফতাহুল জান্নাহ’র পক্ষে সমর্থন জানিয়ে একজন লিখেন, ‘আপনার হিজাবকে রক্ষা করুন।

এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আপনি ইতিমধ্যেই বিজয়ী হয়েছেন।’ আরেকজন লিখেন, ‘আপনিই সত্যিকারের বিজয়ী। হিজাব পরিধান করা চালিয়ে যান এবং কখনো তা খুলে ফেলবেন না।

আপনি সৃষ্টিকর্তার কাছে আরো অনেক বেশী সম্মানিত।’ শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য মিফতাহুল গত ১০ মাস ধরে কঠোর অনুশীলন করেছিলেন।

কিন্তু সোমবার যখন তার এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কথা ছিল, এর একদিন পূর্বেই আয়োজক কমিটি প্রতিযোগিতায় হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মিফতাহুল তার দেশের একজন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ক্রিড়াবিদ।

তিনি বলেন, ‘যত ঝুঁকির কারণ হোক না কেন আমি কখনো হিজাব খুলবো না। হ্যাঁ, আমি খুব খারাপ অনুভব করছি কারণ আমি বিগত ১০ মাস খুব কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। অনেক সময় আমি এত বেশী চর্চা করেছিলাম যে, আমি আমার হাত পর্যন্ত নড়াচড়া করতে পারতাম না।’

‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার সামনে এই ফলাফল আসলো।’ তথাপি চলতি বছরের আগস্ট মাসে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের তায়কোনদো(Taekwondo একধরনের মার্শাল আর্ট)

নামক প্রতিযোগিতায় ইন্দোনেশিয়ার একজন হিজাবী ক্রীড়াবিদ স্বর্ণপদক জয় করেছিলেন।
এ সম্পর্কে এশিয়ান গেমসের জিউ-জিৎসু (jiujitsu, ব্রাজিলিয়ান মার্শাল আর্ট) নামক প্রতিযোগিতার প্যানেল পরিচালক বলেন,

‘এশিয়ান গেমস এবং এশিয়ান প্যারা গেমসের মধ্যকার কোন ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমি এশিয়ান গেমসের জিউ-জিৎসু প্যানেলে ছিলাম সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত,

ইরান এবং ইন্দোনেশিয়ার অনেক হিজাবী ক্রীড়াবিদ অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানে এ নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরী হয় নি। তাহলে হঠাৎ করে এখানে কেন তা সমস্যার কারণ হবে?’

সেন্নি মার্ব্রান যিনি ইন্দোনেশিয়ার প্যারা অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত আছেন তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এ ব্যাপারে ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষক ভালো বলতে পারবেন বলে দায় এড়িয়ে যান।

তিনি বলেন- ‘এই ইস্যুটি খুবই স্পর্শকাতর। আপনারা প্রশিক্ষককে জিজ্ঞেস করুন।’
দলের প্রশিক্ষক লতিফ জানান, ‘কমিটির নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হিজাব নিষিদ্ধ করার বিষয়টি একদিন আগে জানানো হয়েছিল।

আমরা মিফতাহুলের বিষয়টির সমাধানের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে কমিটি জানিয়েছে, এই নিয়ম করা হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে।’

অারো পড়ুন-৫৭ টি দেশ নিয়ে ওঅাইসি’র অার্মি অব ইসলাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরাইল!

ইসরাইলের আগ্রাসন ঠেকাতে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার ‘ওআইসি’ সদস্য ৫৭টি মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা করেছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান।

ওআইসির সদস্য দেশগুলো যদি এই প্রস্তাবে সম্মত হয় তাহলে জেরুসালেম দখলে রাখা ইসরাইলি বাহিনীর জন্য অনেক কঠিন হবে। ‘আর্মি অব ইসলাম’ গঠনের উদ্যোগকে তাই গুরুত্বের সাথেই পর্যবেক্ষণ করছে ইসরাইল।

৫০ লাখের উপরে সদস্য নিয়ে গঠিত এ সেনাবাহিনী ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামে পরিচিত হবে। ইতোমধ্যেই এ সেনাবাহিনী গঠনে ওআইসি ভুক্ত ৫৭ দেশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে, যারা ইসরাইলের আক্রমণ প্রতিরোধ,

প্রয়োজনে দখল করার সমার্থ্য রাখবে।
ওআইসি’র সদস্যভুক্ত ৫৭টি দেশের সক্রিয় সৈন্য রয়েছে প্রায় ৫২ লাখ, সামরিক বাজেট প্রায় ১৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৪ জন, সক্রিয় সেনা রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার; বার্ষিক সামরিক বাজেট প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আরো পড়ুন: একজন এরদোগান একটি ইতিহাস

১৯৯৭ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর এক সরকারি ঘোষণায় তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এর প্রতিবাদে তখন তুরস্কের জনগণ ফুঁসে উঠে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তুরস্ক উত্তাল।

সেই সময় এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়েছিলেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। সে অপরাধেই তাকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তাকে ১০ মাস কারাভোগও করতে হয়েছিল।

কী ছিল সেই কবিতার ভাষা। সেদিন তিনি কাব্যময়তায় আবৃত্তি করেন ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়োনেট এবং বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক।’

মূলত এটি কোনো প্রথিতযশা কবির কবিতা বা কাব্যের অংশ নয়। এক অপরাজেয় সৈনিকের তেজস্বী উচ্চারণ। সেই অপরাজেয় সৈনিকই আজকের মহানায়ক এরদোগান।

তিনি কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়েছেন। সকল বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা তার গতি এখন দুর্নিবার-দুর্বিনীত।

তিনি তুর্কি জাতির মুক্তির জন্য হাতে তুলে নেন এক আলোকবর্তিকা। তার মধ্যে যে আলোর স্ফুরণ ঘটেছে, তা কি কখনো প্রতিরোধযোগ্য? কখনোই নয়। তাই কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এখন নায়ক থেকে মহানায়ক।

অন্যদের মত তিনি শুধু তুরস্কের রাষ্ট্রনায়কই নন, বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এক রোলমডেল।

এরদোগান, পৃথিবীতে এই মুহুর্তে একটি বহুল আলোচিত নাম। বিশেষত গত বছর ঘটে যাওয়া ব্যর্থ সেনা অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে সারা দুনিয়াতে আবারো আলোচনায় এসেছে তুরস্ক এবং এর প্রেসিডেন্ট এরদোগান।

যার ডাকে লাখ লাখ দেশপ্রেমিক জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এমনকি ট্যাঙ্কের সামনে সেনা অভ্যুত্থান রুখতে জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি অনেকে। এভাবে জনগণের স্বতঃফূর্তভাবে রাতে রাস্তায় নামার ফলে ব্যর্থ হতে বাধ্য হয় কতিপয় বিদ্রোহী সেনার অভ্যুত্থান।

এদিকে এক বছরের মধ্যেই গত ১৬ এপ্রিল এরদোগানের জনপ্রিয়তাও অনেকটা যাচাই হয়ে গেল রেফারেন্ডামের মাধ্যমে। দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী শক্তি এবং ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে তুর্কি জনগণ।

জনগণের এই রায় তুরস্কের ইতিহাসে আরেকটি অনন্য অধ্যায়। এতো বিরোধিতার পরও তুর্কি জনগণ কেন এরদোগানের পক্ষে এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে, এর পেছনে কী কারণ রয়েছে এসব নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিস্ময়কর এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তুরস্কের হাল ধরেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। অতি অল্প সময়ের মধ্য দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। দারিদ্র্য অবস্থা থেকে লাখ লাখ মানুষকে বের করে আনা হয়েছে।

কে এই এরদোগান?

বর্তমান বিশ্বে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক যিনি পার্লামেন্ট মসজিদে মাঝে মাঝেই নামাজের ইমামতি করেন। তুরস্কের অনেক মসজিদে নামাজের ইমামতি করেছেন তিনি। তার উদ্যোগে প্রতি বছর তুরস্কে বিশ্ব-

কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাফেজরা অংশ গ্রহণ করে থাকেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন তিনি।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্মপালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐতিহ্য, তাহজীব-তামাদ্দুন ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন।

তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই তো এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেও।

বছর তিনেক আগে তুরস্কে সফরে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।

১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মহানায়ক। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে, অতিসাধারণভাবে। ১৩ বছর বয়সে আসেন ইস্তাম্বুলে। জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু,

তিল ও ঝুটি। কিন্তু তিনি জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি। চলেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলেন তিনি। তিনি উচ্চশিক্ষা নিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে যোগ দেন ইসলামী আন্দোলনে।

তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে জীবনোদ্দেশ্য হিসেবেই গ্রহণ করেন। খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসেনানির ভূমিকা গ্রহণ করেন। ফলে তার জীবনের গতিধারা পাল্টাতে শুরু করে। অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতা তাকে অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্যে অবিচল-বিরামহীন।

এক সময়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা, যোগ্যতা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও দূরদর্শিতার কারণে ক্রমেই মহীরূহে পরিণত হন, যা গোটা বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

তিনি অবতীর্ণ হন নির্বাচন যুদ্ধে। আসে এক সময়োচিত ও বিরোচিত বিজয়। ১৯৯৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। আবির্ভূত হন এক তরিৎকর্মা ও সব্যসাচী মেয়র হিসাবে।

Facebook Comments