কাশ্মিরে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করুন: ভারতকে ওআইসি

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি’র মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমাদ আল আসিমিন কাশ্মিরি জনগণের ওপর হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও তাদের অধিকার রক্ষার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ভারতকে অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে ও জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মির সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং ওই এলাকার জনগণের দাবির প্রতি সম্মান জানাতে হবে। ওআইসি মহাসচিব ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের-

সমালোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব কাশ্মিরে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানান। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব এবং দীর্ঘ দিনের সংকট নিরসনের জন্য ওআইসি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে কাশ্মিরের জনগণ আশা করছে।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কাশ্মিরের মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। কাশ্মির সংকট বিশ্বের অন্যতম একটি পুরাতন সংকট যা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের জনগণের দুর্দশার কারণ।

কাশ্মির সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব পাশ হয়। প্রস্তাবে গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলা হয় যাতে ওই এলাকার জনগণ তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

কিন্তু ভারত আজ পর্যন্ত জাতিসংঘের এ প্রস্তাব বাস্তবায়নতো করেনি বরং ওই এলাকাকে তারা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং এ নিয়ে আলোচনায় বসতেও তারা রাজি নয়।
কাবুল বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইয়্যেদ রহমতুল্লাহ নাসেরি বলেছেন,

“ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের জনগণের ওপর পুলিশের হত্যা নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনকারী ওই এলাকার মানুষের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং হত্যাযজ্ঞ-

চালানো হচ্ছে তা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না। পাকিস্তান মনে করে কাশ্মির সংকট ভারতের সঙ্গে তাদের বিরোধের প্রধান কারণ। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত ভারত এ সংকট নিরসনে কার্যকর-

পদক্ষেপ না নেবে ততদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা ও সংকট অব্যাহত থাকবে। যদিও ভারত সরকার কেবল কাশ্মিরের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে আলোচনার কথা বলে আসছে এবং তা অবশ্যই-

হতে হবে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী। কিন্তু কাশ্মিরের কোনো গ্রুপ দিল্লির এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। তাদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী সংলাপের অর্থই হচ্ছে ভারতের আধিপত্য মেনে নেয়া।

ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক প্রকাশ মালিক মনে করেন, “সেদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত কাশ্মিরি জনগণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা এবং বিরাজমান ভুল বোঝাবুঝি ও সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া।

” তিনি বলেন, “কাশ্মির সংকট নিরসনে কেবল সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করা নয়া দিল্লীর উচিত হবে না। কারণ কেবল সেনাবাহিনী দিয়ে কাশ্মির সংকট সমাধান ও সেখানকার জনগণের অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়।

তাই রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে।”
যাইহোক, ওআইসি হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর সবচেয়ে বড় জোট বা সংস্থা। এ কারণে কাশ্মির সংকট নিরসনে ওআইসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে কাশ্মিরের জনগণ আশা করছে।

ভারত কাশ্মির সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কোনো দেশের অংশগ্রহণের বিরোধী। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মির সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সমাজের অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে যাতে সংকট নিরসনে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।

এ অবস্থায় কাশ্মির সংকট নিরসনে ওআইসি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

আরো পড়ুন

একজন এরদোগান একটি ইতিহাস

১৯৯৭ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর এক সরকারি ঘোষণায় তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এর প্রতিবাদে তখন তুরস্কের জনগণ ফুঁসে উঠে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তুরস্ক উত্তাল।

সেই সময় এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়েছিলেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। সে অপরাধেই তাকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তাকে ১০ মাস কারাভোগও করতে হয়েছিল।

কী ছিল সেই কবিতার ভাষা। সেদিন তিনি কাব্যময়তায় আবৃত্তি করেন— ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়োনেট এবং বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক।’

মূলত এটি কোনো প্রথিতযশা কবির কবিতা বা কাব্যের অংশ নয়। এক অপরাজেয় সৈনিকের তেজস্বী উচ্চারণ। সেই অপরাজেয় সৈনিকই আজকের মহানায়ক এরদোগান।

তিনি কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়েছেন। সকল বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা তার গতি এখন দুর্নিবার-দুর্বিনীত।

তিনি তুর্কি জাতির মুক্তির জন্য হাতে তুলে নেন এক আলোকবর্তিকা। তার মধ্যে যে আলোর স্ফুরণ ঘটেছে, তা কি কখনো প্রতিরোধযোগ্য? কখনোই নয়। তাই কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এখন নায়ক থেকে মহানায়ক।

অন্যদের মত তিনি শুধু তুরস্কের রাষ্ট্রনায়কই নন, বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এক রোলমডেল।

এরদোগান, পৃথিবীতে এই মুহুর্তে একটি বহুল আলোচিত নাম। বিশেষত গত বছর ঘটে যাওয়া ব্যর্থ সেনা অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে সারা দুনিয়াতে আবারো আলোচনায় এসেছে তুরস্ক এবং এর প্রেসিডেন্ট এরদোগান।

যার ডাকে লাখ লাখ দেশপ্রেমিক জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এমনকি ট্যাঙ্কের সামনে সেনা অভ্যুত্থান রুখতে জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি অনেকে। এভাবে জনগণের স্বতঃফূর্তভাবে রাতে রাস্তায় নামার ফলে ব্যর্থ হতে বাধ্য হয় কতিপয় বিদ্রোহী সেনার অভ্যুত্থান।

এদিকে এক বছরের মধ্যেই গত ১৬ এপ্রিল এরদোগানের জনপ্রিয়তাও অনেকটা যাচাই হয়ে গেল রেফারেন্ডামের মাধ্যমে। দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী শক্তি এবং ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে তুর্কি জনগণ।

জনগণের এই রায় তুরস্কের ইতিহাসে আরেকটি অনন্য অধ্যায়। এতো বিরোধিতার পরও তুর্কি জনগণ কেন এরদোগানের পক্ষে এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে, এর পেছনে কী কারণ রয়েছে এসব নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিস্ময়কর এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তুরস্কের হাল ধরেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। অতি অল্প সময়ের মধ্য দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। দারিদ্র্য অবস্থা থেকে লাখ লাখ মানুষকে বের করে আনা হয়েছে।

কে এই এরদোগান?

বর্তমান বিশ্বে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক যিনি পার্লামেন্ট মসজিদে মাঝে মাঝেই নামাজের ইমামতি করেন। তুরস্কের অনেক মসজিদে নামাজের ইমামতি করেছেন তিনি। তার উদ্যোগে প্রতি বছর তুরস্কে বিশ্ব-

কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাফেজরা অংশ গ্রহণ করে থাকেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন তিনি।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্মপালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐতিহ্য, তাহজীব-তামাদ্দুন ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন।

তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই তো এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেও।

বছর তিনেক আগে তুরস্কে সফরে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।

১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মহানায়ক। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে, অতিসাধারণভাবে। ১৩ বছর বয়সে আসেন ইস্তাম্বুলে। জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু,

তিল ও ঝুটি। কিন্তু তিনি জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি। চলেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলেন তিনি। তিনি উচ্চশিক্ষা নিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে যোগ দেন ইসলামী আন্দোলনে।

তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে জীবনোদ্দেশ্য হিসেবেই গ্রহণ করেন। খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসেনানির ভূমিকা গ্রহণ করেন। ফলে তার জীবনের গতিধারা পাল্টাতে শুরু করে। অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতা তাকে অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্যে অবিচল-বিরামহীন।

এক সময়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা, যোগ্যতা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও দূরদর্শিতার কারণে ক্রমেই মহীরূহে পরিণত হন, যা গোটা বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

তিনি অবতীর্ণ হন নির্বাচন যুদ্ধে। আসে এক সময়োচিত ও বিরোচিত বিজয়। ১৯৯৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। আবির্ভূত হন এক তরিৎকর্মা ও সব্যসাচী মেয়র হিসাবে। তখন ইস্তাম্বুল নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নগরবাসীর জীবনযাত্রার ছিল খুবই নিম্নমানের।

কিন্তু এরদোগানের সোনার কাঠি-রূপোর কাঠির জাদুকরী ছোঁয়ায় সবকিছু পাল্টাতে শুরু করে। দেড় কোটি মানুষের শহর ইস্তাম্বুলে তখন তিনি যানজট, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট ও বায়ুদূষণ রোধ করে নগরের চেহারা পাল্টে দেন।

নাগরিক সেবার পরসির বৃদ্ধি করা হয়। ইস্তাম্বুল পরিণত হয় এক সর্বাধুনিক মহানগরীতে, যা বর্তমান বিশ্বের জন্য রোল মডেল। শুরু হয় এরদোগানের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। তার দীর্ঘদিনের মিত্র আব্দুল্লাহ গুল ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ২০০১ সালে একেপি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

অতি অল্পসময়ের মধ্যেই নতুন প্রতিষ্ঠিত দলটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। দেশের মানুষ একে পার্টিকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নেয়। ২০০২ সাল থেকে দলটি প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে।

একে পার্টি ২০০২ সালে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে প্রথমবার ক্ষমতাসীন হয়। ২০০২ সালে একে পার্টি আসন পেয়েছিল ৩৬৩টি, ২০০৭ সালে ৩৪১, ২০১১ সালে ৩২৭ এবং ২০১৫ সালের জুন মাসের নির্বাচনে ২৫৮টি আসন।

Facebook Comments