কোথায় আছে গুম হওয়া শিবির নেতা শাফিউল? -আবু সালেহ ইয়াহইয়া

ছাত্রনেতা শাফিউল। একজন মেধাবী ছাত্র, পরিশ্রমী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ। হজ্জ ফেরত মা ও বড় ভাইকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে গেলে গুম করে নিয়ে যায় আওয়ামী ডিবি বাহীনি। সাথে তার ছোট ভাইকেও।

আজ প্রায় ১৫ দিন হতে চলেছে। এখনো তাদের কোন খোজ নেই। তার অপরাধ, সে শিবিরের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য।

শাফিউল আমাদের হাত দিয়ে গড়ে উঠা (২০০৫-২০১০ সময়কালে) একজন দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত প্রাণ কর্মী ও নেতা। তার মা বাবা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের উদ্বেগ ও ফিরিয়ে দেবার দাবি জানিয়েছেন। অনেক মিডিয়ায় এসেছে তার গুমের খবর।

শাফিউল কোথায় আছে, কেমন আছে কেউ তা সঠিকভাবে জানেনা। তবে আমি কিছুটা কল্পনা করতে পারি হয়তো ।
ঢাকার মিন্টু রোডের ডিবি অফিস। নিচ তলার অস্ত্রাগারের পাশের ছোট্ট দুই রুমের কোন একটিতেই আছে শাফিউল।

বামের রুমটা বেশি অন্ধকার, ময়লা আবর্জনাযুক্ত কিছু কম্বল মেঝেতে বিছানো। খোলা বাথরুমের দরজাটা নিচের থেকে অনেকটা ভাঙা। শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে যেখানে সর্বোচ্চ দশজন শুইতে পারে, সেখানে তারা রাখে বিশ জনেরও বেশি।

শাফিউল হয়তো সেখানেই আছে। হাত, পা, কোমরের বিভিন্ন জোড়ায় ইতোমধ্যে কয়েকদফা বেদম লাঠিপেটার নির্মম যন্ত্রনা (ন্যুনতম ও সম্মানজনক কষ্ট) নিয়ে হয়ত কাতরাচ্ছে সে।

ওরা আমাকেও এখানে রেখেছিল ৩ দিন ৩ রাত।

অথবা শাফিউল আছে এর পাশের রুমেই। এই রুমটাতে অন্যটির চেয়ে একটু বেশি আলো আছে। মেঝে মোজাইক করা। এখানে কোন কম্বল নেই। রুমটা একটু বড় এবং বাথরুমটা অন্যটার চেয়ে একটু পরিস্কার। বড় মাপের নেতা ও ভিআইপিদের ডিবি এখানেই রাখে।

পাশেই অস্ত্রাগার। ডিবি কর্মকর্তাদের অস্ত্র নেয়া ও অস্ত্র জমা দেয়ার শব্দ এখান থেকে পরিস্কার শুনা ও বুঝা যায়। এখানে শিবিরের সাবেক সভাপতি সাঈদী ভাই ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, আমারদেশ সম্পাদক জনাব মাহমুদুর রহমান এবং দেশ খ্যাত টপ লেভেলের কিছু সন্ত্রাসীসহ আমাকেও এক রাত এক দিন থাকতে হয়েছিল।

শাফিউল যদি বেঁচে থাকে এখনো (প্রাত্যাশা ও দোয়া তাই) তাহলে এ দু’রুমের কোন একটিতেই আছে। প্রথমটাতে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। দিনে দু ‘একবার করে হয়ত তাকে দু তলার ডিবি অফিসারদের কোন একটি রুমে নিয়ে চোখ বেধে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নানা রকম নির্যাতন করা হচ্ছে।

দু-তিন ঘন্টা নির্যাতনের পর পাঁজাকোলা করে নিয়ে এসে আবার এই রুমের মেঝেতেই ধপাস করে ফেলে দিচ্ছে হয়তো । পায়ের উপর ভর করে বাথরুমে যেতে পারছে কিনা জানিনা। পাশে কোন দরদী আসামী বা অন্য কেউ থাকলে হয়ত তাকে সাহায্য করছে।

পাশের অস্ত্রাগারের অস্ত্রের শব্দ শুনতে শুনতে সে হয়তো প্রস্তুতি নিয়েই আছে যে কোন সময় একটি বুলেটই তার প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। ময়লা মেঝেতেই সিজদা করতে করতে মাবুদের কাছ থেকে আমলের ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য মাফ চেয়ে নিচ্ছে।

পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে কি প্রশ্ন করতে পারে, তার সম্ভাব্য উত্তর গুলো হয়তো এলোমেলোভাবে মাথায় সাজিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। সে হয়ত কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। কিন্তু চোখের পানি এখন আর পড়ছে না। শুকিয়ে যাবার কথা অনেক আগেই।

না, শাফিউল তার নিজের প্রাণের মায়ায় কিংবা আঘাতের যন্ত্রনায় কাঁদছেনা। সে কাঁদছে তার সন্ধানে পাগলপারা ও কান্নার নোনাজলে ভেসে যাওয়া তার মায়ের কথা ভেবে। যে মায়ের জন্য সে এ পৃথিবীর আলো দেখতে পেরেছে,

সেই মা নাজানি কি কষ্টে আছেন তাকে না পেয়ে। কাঁদত কাঁদতে, না খেয়ে, না ঘুমিয়ে নাজানি কি এক অসহ যন্ত্রনায় সময় পার করছেন তারা। এ সময়টাতে মাবুদের পর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে এই মা বাবার কথাই। তারপর আন্দোলন, সংগঠন ইত্যাদি।

এই গুম হয়ে থাকা সময়ের চেয়ে অসহায় কোন সময় মানুষের জীবনে আসে কিনা আমার জানা নেই। সারাদিন মটর সাইকেল হাকিয়ে রাজধানী ঢাকার কিংবা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো যার কাজ, সে আজ জানেইনা বাইরে কি হচ্ছে। জেল থেকে অনেক কিছু জানা গেলেও ডিবি অফিস বা তাদের টর্চার সেল থেকে কিছুই জানার সুযোগ নেই।

শাফিউলের আগে কত শত ভাই, কত নেতা এভাবে এই স্থানে থেকে নির্যাতনের স্টীমরোলার সহ্য করেছেন তার হিসাব হয়তো কোন দিন কেউ জানবেনা। কত মজলুম ভাই, কত নিষ্পাপ তরুন এখান থেকে ফিরে আসতে পারেন নি।

টীমে (ডিবির ভাষা) নেয়ার কথা বলে রাতের অন্ধকারে দূরে কোথাও নিয়ে হায়েনারা ঝাঝরা করে দিয়েছে তাদের তরতাজা বুকগুলো। মিডিয়ার সামনে সাজিয়েছে ক্রসফায়ারের গল্প।

কারো লাশ পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায় কোন খাল, মাঠ বা নর্দমার পাশে। কারো লাশ খুজেই পাওয়া যায়নি এখনো। ইতিহাসের কোন পাতায় হয়তো কোনদিন খুঁজে পাওয়া যাবেনা এদের কাহীনি।

কেউ কেউ আবার মাবুদের ইচ্ছায় নতুন জীবন ফিরে পাবার মত করে এখান থেকে ফিরে এসেছেন। দেখে এসেছেন কিছু নরপিশাচদের ভয়ংকর কিছু চেহারা। মানুষের রুপে এই সমাজে ঘুরে বেড়ানো কিছু মানুষ,

ডিবি অফিসের চার দেয়ালের ভেতরে অসহায় বন্দী মানুষের সাথে কেমন ভয়ানক হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হতে পারে, তার সাক্ষী হয়ে এসেছেন তারা।

মিডিয়ার সামনে মিষ্টি ভাষায় বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা মানুষগুলো যে একেকটা কত বড় মাপের কিলার, পরিস্থিতির শিকার না হলে নিজেও হয়তো কোন দিন বিশ্বাস করতে পারতামনা। যাই হোক, শাফিউল, তার ভাই ও দলের অন্য কর্মীরা সুস্থভাবেই ফিরে আসুক তাদের মায়ের কোলে, প্রাণভরে এই দোয়াই করছি।

লেখক: সাবেক কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

আরো পড়ুন:জাতীয় ঐক্যের ৫দফা বিএনপি জামায়াতের ফটোকপি :ইনু

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’য় দুই প্রবীণ রাজনীতিবিদের পাঁচ দফা দাবি এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বিএনপি-জামায়াতের দাবি ও অবস্থানের ফটোকপি।

এদিকে সংসদে পাস হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাকস্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে ব্যাহত করবে, এমন উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী বলেন,

বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই সব আইন হবে। কোনো সাংঘর্ষিক আইন পার্লামেন্ট পাস করবে না, পাস করলেও তা আদালতে নাকচ হয়ে যাবে।

মঙ্গলবার দুপুরে সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত তথা ২০ দলীয় জোটের মতোই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্টের পাঁচ দফা দাবি দেখে এটা সুস্পষ্ট যে, তারা সাংবিধানিক সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে অস্বাভাবিক সরকার আনতে চাইছেন।

গত শনিবার পাঁচ দফা দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং নয়টি লক্ষ্য বাস্তবায়নে জোটবদ্ধ নির্বাচন, সৎ, যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আইন প্রণয়ন-শাসন কাজ পরিচালনার অঙ্গীকার করে জাতীয় ঐক্য গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

হাসানুল হক ইনু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১০ বছরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা, নির্বাচন বানচাল করা, দেশকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দেওয়ার জন্য যে সহিংসতা-নাশকতা-অন্তর্ঘাত-জঙ্গি-আগুন সন্ত্রাস হয়েছে সে বিষয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করে আসছে।

তাদের এই নীরবতা সহিংসতা-নাশকতা-অন্তর্ঘাত-জঙ্গি-আগুন সন্ত্রাসকেই সমর্থন দিয়ে গেছে।

আমরা আশা করেছিলাম, এই প্রবীণ রাজনীতিকরা দেশের মূল রাজনৈতিক সমস্যা জঙ্গি সন্ত্রাসের আপদ-বিপদ-হুমকি-ঝুঁকি মোকাবিলা করা, জঙ্গি-সন্ত্রাসে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা-পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক অপতৎপরতা মোকাবিলা করা।

শান্তি ও উন্নয়ন ধারা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যে আমি হতাশ হয়েছি, বলেন তথ্যমন্ত্রী।

যুক্তফ্রন্টের পাঁচ দফা দাবির বিষয়ে সরকারের বক্তব্য তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্ট যে পাঁচ দফা দিয়েছে তা নতুন কিছু নয় বিএনপি-জামায়াত-২০ দলীয় জোটের দাবি পুনরুল্লেখ ও প্রতিধ্বনি মাত্র।

তাদের পাঁচ দফা দাবি সাংবিধানিকভাবে ও আদালতের রায় মীমাংসিত বিষয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত।

নির্বাচনকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সিভিল প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করার সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরও তারা বিএনপি-জামায়াত ২০ দলীয় জোটের মতোই ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা বলে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার দাবি করেছেন মাত্র। এটা অস্বাভাবিক সরকার আনার ষড়যন্ত্র।

হাসানুল হক ইনু বলেন, সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনা মামলা প্রত্যাহার ও তাদের মুক্তি এবং এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার না করার দাবি করে তারা আইন আদালত বিচার সবকিছু বন্ধ করে রাখার আবদার করেছেন। এটা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব।

সব রাজনৈতিক দল-শব্দের আড়ালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মামলা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা জঙ্গি সন্ত্রাস আগুন সন্ত্রাসের মামলায় অভিযোগে আটক দণ্ডিতদের মুক্তি চাওয়ার নামান্তর। এটা ভয়াবহ প্রস্তাব।

তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করার দাবিও কালক্ষেপণ করে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করে দেশকে নির্বাচনের বাইরে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র। পাঁচ দফা দাবি নাকচ করে দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আশা করি ড. কামাল নির্বাচনকালীন সরকারের একটি স্থায়ী ফর্মা করে দেবেন।

আজকালের খবর/আরএম

Facebook Comments