এবার বিশ্ব বাণিজ্যের ডলার বর্জনের ডাক দিলেন – এরদোগান !

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান বিশ্ববাণিজ্যে ডলার বর্জনের ডাক দিয়েছেন। রোববার কিরঘিস্তানের রাজধানী বিশকেক এ তুরস্ক-কিরঘিস্তান ব্যাবসায়ী ফোরামে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান করেন।

তুরস্কের সংবাদ মাধ্যম ডেইলি সাবাহ এ সংবাদ প্রকাশ করেছে।

ডলারের রাজত্ব শেষ করে দেশগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য করার আহ্বান করেন এরদোগান।

বক্তৃতায় এরদোগান আরো বলেন, মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা সুবিধার চেয়ে বিপদে ফেলেছে বেশি। তুরস্কের ওপর আক্রমন এর পরিস্কার উদাহরণ। মুদ্রাবাজার এলোমেলো করে আমেরিকা তুরস্কের শক্ত ও দৃঢ় অর্থনীতিকে দুর্বল করতে চেয়েছে।

এরদোগান আরো বলেন, তুরস্কের অর্থনীতি আক্রমণের শিকার হওয়ায় আমরা স্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে আগাচ্ছি।

চীন ও রাশিয়ার সাথে মার্কিন ডলার বাদ দিয়ে দেশগুলোর সাথে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করার কথা ব্যক্ত করে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, আমাদের সর্বশেষ এই পদক্ষেপ প্রমাণ করবে আমরা সঠিক পথে আছি।

এরদোগান বলেন, কিরঘিস্তানের সাথে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বিষয়টি তুরস্ক বিবেচনায় নিয়েছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমেরিকা ও তুরস্ক বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। আমেরিকা তুরস্কের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং তুর্কি স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ করে।

ফলে তুর্কি মুদ্রা লিরার দরপতন ঘটে। এতে অল্প সময়ের ব্যবধানে তুরস্কে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট এরদোগান আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের মার্কিন ডলারে বিশ্ববাণিজ্য বা লেনদেন বর্জনের ডাক দিলেন।

আমেরিকাকে কড়া সতর্কতা তুর্কি অর্থমন্ত্রীর

ডলারের বিপরীতে লিরার দরপতনে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন তুরস্কের অর্থমন্ত্রী বেরাট আলবাইরাক। তিনি বলেন, লিরার মান কমার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক বৈঠক শেষে আলবাইরাক এ সতর্কতা জারি করেন।

তিনি বলেন, তুরস্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিধি আরোপ মূলত আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেবে আর অভিবাসন সমস্যাকে গভীর কর তুলবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এ পরিস্থিতিতে আলবাইরাক ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের বাণিজ্যচুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের মন-কষাকষির ফলে এ বছর ডলারের বিপরীতের লিরার দরপতন হয়েছে ৩৮ শতাংশ। গত মঙ্গলবার ডলারের বিপরীতে লিরার মূল্যমান ছিল ৬ দশমিক ২০, যা তার আগের দিন সোমবার ছিল ৬ দশমিক ১২।

গত মাসের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের ওপর যে অর্থনৈতিক বিধি আরোপ করেন, তা মূলত দুটি পণ্যের ওপর। এ দুটি পণ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত তুরস্কের অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল।

ট্রাম্প এই দুটি পণ্যের ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করেন। এর ফলে তুরস্কের রপ্তানি আয় কমে যায়। পক্ষান্তরে বেড়ে যায় আমদানি ব্যয়। দরপতন হয় লিরার।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক বিধি আরোপের পেছনে রয়েছে ভিন্ন কারণ। মনে করা হয়, এই বিধি আরোপের সূত্রপাত তুরস্কে বসবাসরত খ্রিষ্টান ধর্মযাজক এন্ড্রু ব্রানসনকে নিয়ে। কারণ ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তুরস্কে যে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান হয়েছিল, তাতে এন্ড্রু ব্রানসনও জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ। এ অভিযোগে তুরস্কের সরকার ব্রানসনকে গ্রেপ্তারও করে। পরে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠান এবং সর্বশেষ গৃহবন্দীর আদেশ দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সত্ত্বেও ব্রানসনের জামিন না দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় গত মাসের প্রথম সপ্তাহে তুরস্কের দুই মন্ত্রীর ওপর প্রথমে অবরোধ আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরের সপ্তাহেই অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল পণ্যের ওপর এই শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দেন ট্রাম্প।

তুরস্ককে সহযোগিতা করতে চায় যুক্তরাজ্য
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তুর্কি অর্থনীতির চলমান সমস্যা নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সাথে টেলিফোনে আলোচনা করেন।

তাদের উভয়ের আলোচনার পরেই থেরেসা মে’র দপ্তর থেকে জানানো হয়, ব্রিটেন তুর্কি অর্থনীতির ক্রমোন্নতি চায় এবং দেশটি তুরস্কের অর্থমন্ত্রীকে ব্রিটেন সফরের জন্য স্বাগত জানাচ্ছে।

বিবৃতি অনুযায়ী, দুই নেতা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের চলমান সংঘাতে সেনা আগ্রাসন নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন এবং তারা ওই অঞ্চলে সম্ভাব্য রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও তাদের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে তুরস্কের অর্থনীতি নিম্নমুখী হওয়ার কারণে বার্লিন এই শঙ্কায় রয়েছে যে, এর প্রভাব হয়ত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা খুব ভয়ানক ফলাফল ঢেকে আনবে।

জার্মানির কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, তুরস্কের অর্থনীতি ধ্বসে পড়ার প্রভাবে এই অঞ্চল, জার্মানি এবং ইউরোপকে অস্থিতিশীলতার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। আর বার্লিনের এই উদ্বিগ্নতার কারণে জার্মান সরকার তুরস্ককে জরুতি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তার চিন্তাভাবনা করছে।

যদিও উভয় দেশের মধ্যে এধরনের আলোচনা এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। সেই সাথে সহায়তার করার বিষয়টিও এখনো আশা পর্যায়ে রয়েছে।

বার্লিনের সূত্র বলছে, আর্থিক সহায়তার সম্ভাব্যতা এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। আর তা করা হলে এটি হতে পারে তখনকার সময়ের মত যখন ইউরোপের অর্থনীতির দুঃসময়ে ইউরোজোনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো প্রকল্প ভিত্তিক সুনির্দিষ্টভাবে লোন প্রদান করেছিল।

তুরস্ককে নৈতিক সমর্থন জানালো চীন, ৩৮০ কোটি ডলারের চুক্তি
মার্কিন এক যাজককে গ্রেপ্তার করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার মধ্যে যখন টানাপোড়েনের মধ্যে তুরস্কের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে চীন।

এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা আশা করে তুরস্ক তাদের এ ‘সাময়িক’ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। দুই বছর আগে তুরস্কে যে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান হয় তাতে ব্রানসন নামের ওই মার্কিন যাজকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে তুরস্ক। এখন দেশটির আইন অনুযায়ী তার বিচার চলছে।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে মুক্তি দিতে তুরস্কের ওপর চাপ দিয়ে আসছেন। কিন্তু আঙ্কারা বলছে, আইন সবার জন্য সমান। তুরস্কের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে।

কিন্তু তুরস্কের এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প এবং কয়েকদিন আগে তুরস্কের স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করেন।

এ অবস্থায় মার্কিন ডলারের তুলনায় তুর্কি মুদ্রা লিরার মূল্য কমে গেছে। যদিও আঙ্কারা মার্কিন যাত্রীবাহী বিমান, অ্যালকোহল ও তামাকজাতীয় পণ্য আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করেছে।

এই অবস্থায় সামরিক জোট ন্যাটোর এই দুই সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাপক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত শুক্রবার এ বিষয়ে প্রথমবারের মতো মন্তব্য করলো বেইজিং।

প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই পদক্ষেপের পর নিজেদের অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন কিছু নীতি নির্ধারণ করেছে আঙ্কারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগও করা হচ্ছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তুর্কি অর্থনীতির ‘নতুন নীতি’ এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি তাদের নজরে আছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ধনশীল বাজার এবং এটি নিজে যেমন স্থিতিশীল রয়েছে তেমনি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার উন্নয়নে ভূমিকা রেখে লাভবান হচ্ছে।’

তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীন বিশ্বাস করে সাময়িক অর্থনৈতিক অসুবিধা কাটিয়ে উঠার সক্ষমতা তুরস্কের আছে। সেইসঙ্গে এটাও আশা করে যে, সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো মিটিয়ে ফেলবে।’

এ ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক চায়না তুরস্কের সঙ্গে ৩৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে বলে গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে।

গত মাসে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়া ওই অর্থনৈতিক চুক্তির কথা জানায়। কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শুক্রবারের ওই বিবৃতিতে বল হয়েছে, বেইজিং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি সব সময় সমর্থন করেছে এবং বাজার নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন চুক্তি করছে।

উল্লেখ্য, উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের দমন-পীড়নের কারণে দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হলেও সম্প্রতি সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগী হয়েছে বেইজিং ও আঙ্কারা। চীনের দূর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের ওই উইঘুর মুসলিমরা তুর্কি ভাষাভাষী।

Facebook Comments