ছাত্রলীগ ডাকুন, সাহায্য নিন!-আহসান কবির

রাজনৈতিক কৌতুক ছড়িয়ে পড়েছে। কৌতুকটা এমন–খালেদা জিয়া নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাদের খুঁজছেন! দেখা হলে নাকি জানতে চাইবেন–এতদিন কোথায় ছিলেন? ২০১৪ সালের শুরুতে সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল এবং ১১টি ট্রাক দিয়ে তখন খালেদা জিয়ার গুলশান অফিস ঘিরে রাখা হয়েছিল। তার বিশ্বাস, ছাত্রলীগের ছেলেদের সন্ধান পেলে তিনি তাদের ডাকতেন এবং তারা তাকে সেই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে আনতে পারতো, যেভাবে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রলীগ উদ্ধার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে।

‘হটলাইন’বলে একটা জিনিস আছে। ছাত্রলীগের এমন একটা ‘হটলাইন’ থাকা উচিত। যে কেউ যখন-তখন চাইলেই যেন ছাত্রলীগকে ডাকতে পারেন। ছাত্রলীগকে টান টান উত্তেজনার আরও অনেক কাজে ব্যবহার করা যাবে তখন। গুগল নামের সার্চ ইঞ্জিনে ছাত্রলীগ লিখে সার্চ দিলে যা যা আসে, ছাত্রলীগকে সেসব কাজেই ব্যবহার করা যেতে পারে! হোক সেটা বিশ্বজিতের মতো প্রকাশ্যে খুন কিংবা আবু বকর সিদ্দিকের মতো মাঝরাতে খুন। টেন্ডারবাজি, হল দখল কিংবা দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে কাউকে ‘সাইজ’ করার জন্যও তাদের ডাকা যেতে পারে। আবু বকরের খুন হওয়ার ভেতর একটা অন্যরকম সংকেতও আছে। সংকেতটা এমন—‘মারবো এখানে, লাশ পড়বে আজিমপুরে মাগার বিচারে কারও কোনও সাজাই হবে না’।

ছাত্রলীগকে নিয়ে লেখার ‘হ্যাপা’ অনেক। কারণ এদেশে আজকাল নাকি কেউ আর মানুষ নেই। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। ছাত্রলীগকে নিয়ে সত্য কথা লিখলে অনেকেই মনে করে নেন, যিনি লিখছেন, তিনি বিএনপি বা জামায়াতের দোসর। এরপরও ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা যা যা করেছে, তার সার-সংক্ষেপ এমন:

এক. আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছাত্রলীগ বেপোরোয়া হয়ে ওঠে। দল ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে সরকারি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে হাওয়া হয়ে যায় তারা। ক্ষমতার কারণেই তারা বীরপুরুষ। আসলে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভ এদেশের অনেক রাজনীতিবিদের চরিত্র নষ্ট করেছে আগেই। গত বিশ বছরে তাই বড়দের পথ ধরে হাঁটছে ছোটরা। স্যালুট টু হুমায়ুন আজাদ। ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’!

দুই. ছাত্রলীগ আর ছাত্রদল নিয়ে একইরকম মূল্যায়ন আছে। কে ভালো আর কে খারাপ, তা বলা খুবই কঠিন। গত দশ বছর ছাত্রলীগের দাপট দেখা যাচ্ছে বলে ছাত্রলীগ নিয়ে কিছু আদিখ্যেতাও দেখা যায়। সেসব এমন:

ক. ছাত্রলীগ সন্ত্রাস করে না। তারা স্বাধীনতার চেতনায় বলিয়ান একটা সংগঠন। যারা ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এসব করে তারা ছাত্রলীগের কেউ নয়! তারা অনুপ্রবেশকারী, বহিরাগত, বিএনপির দালাল!

খ.ছাত্রলীগ নিয়ে অতি রোমান্টিক কেউ কেউ এবং পুরনো নেতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন আমরা দুঃখিত! হায় ছাত্রলীগের পক্ষে এমন কাজ করাও সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সব সাফল্য এদের জন্য ম্লান হয়ে যাবে!

গ. ছাত্রদলের একই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিবরণ দিয়ে কেউ কেউ ছাত্রলীগের কার্যকলাপকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন।

ঘ. অবৈধ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের দায়ে কোনও কোনও ছাত্রলীগকর্মী যদি কখনও সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন, তখন কেউ কেউ বলেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে। বাস্তবে এটা হয় না। সরকার আসলে তার ক্ষমতা নিরাপদ রাখার জন্য রাজনীতির এই ‘শিশু শ্রমিক’দের ( ছাত্র রাজনীতি করা ছেলেদের লেখক আহমদ ছফা এই নামেই ডাকতেন) রীতিমতো ব্যবহার করে। আবু বকর হত্যাকাণ্ডের রায়ে কোনও ছাত্রলীগ নেতার তাই শাস্তি হয়নি। ছাত্রলীগের যেসব কর্মী অভিযুক্ত ছিলেন, তারা সুখে আছেন, চাকরি ও ব্যবসা করছেন।

তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদা বলেছিলেন, বিরোধী দলকে শায়েস্তার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাদের হাতে বই খাতাও তুলে দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে সেই তিনিই আবার ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গত নয় বছরে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে ১২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর ভেতরে ৭১ জন ছাত্রলীগকর্মী। ছাত্রলীগের হাতে শিশু, অন্য সংগঠনের কর্মী এবং সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন ৫৪ জন। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রেমিকাকে কোপানো,ধর্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস সব কিছুতেই আছে ছাত্রলীগ। প্রশ্নপত্র ফাঁসকে একসময়ে গুজব বলে প্রচার করেছিল সরকার ও ছাত্রলীগ। পরে ছাত্রলীগকর্মীরাই গ্রেফতার হয়েছে, সংগঠন থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছে।

চার. এরশাদকে ছাত্রনেতারা এ কারণে ধন্যবাদ দিতে পারেন। তিনি দু’বার ডাকসু, রাকসু কিংবা চাকসু নির্বাচন দিয়েছিলেন। হাসিনা ও খালেদার আমলে তাও হয়নি। যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সরকার নিজেদের স্বার্থে ছাত্র সংগঠনগুলোর সব ধরনের অপকর্ম প্রশ্রয় দেয়, তারাই ক্যাম্পাসে নির্বাচন দেয় না, স্বতন্ত্রভাবে যদি কোনও আন্দোলন গড়ে ওঠে ক্যাম্পাসে! যদি কোনও আলাদা নেতৃত্ব তৈরি হয়! ছয় মাসের ভেতর ডাকসু নির্বাচন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়!

পাঁচ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি উদ্ধারের নাটকের ঘটনার মূলে যে সাতটি কলেজের অধিভুক্তির আন্দোলন, সেটি ছাত্রলীগের ইন্ধনেই চলে এসেছিল ক্যাম্পাসে। সাত পাঁচ না ভেবে সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত শিক্ষকদের একটি গ্রুপ ছাত্রলীগের কয়েকজনকে উস্কে দিয়েছিল। সরকারের মনোভাব বুঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পিছুটান দিয়েছেন, ছাত্রলীগের যারা আন্দোলনরত ছাত্রদের সমর্থন দিয়েছিলেন, তারাও পিছুটান দিয়েছেন। ভিসিকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছে আবার সেই ছাত্রলীগ। বিএনপি আমলে আনোয়ার হোসেন বা ফায়েজ সাহেব ভিসি থাকার সময়েও একই ঘটনা ঘটেছিল। রাজনীতির শিশু শ্রমিকদের অপব্যবহার! আগের কালের রাজা জমিদাররা লাঠিয়াল আর সৈন্য পুষতো সম্পদ রক্ষায়। এখন সম্পদ গড়বার জন্য রাজনীতির শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়!

ছয়. গত নয় বছরে খুনোখুনি, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক লাঞ্ছনা, ভর্তিবাণিজ্য, সাংবাদিক ও পুলিশের ওপর হামলাসহ অনেক অপকর্মে বার বার ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করে খবর ছাপা হয়েছে পত্রিকার পাতায়। এ পর্যন্ত সংগঠন থেকে ৭০২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু ক’জনের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকে সেটা নিয়ে খোঁদ ছাত্রলীগেই সন্দেহ এবং সমালোচনা আছে। বিশ্বজিৎসহ ১১টি হত্যা মামলার আসামিদের ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে যা ছবিসহ পত্রিকার পাতায় এসেছে। ২০১৪ সালের ৪ জুন সিলেট ওসমানী মেডিক্যালের ছাত্রদল নেতা তাওহীদ খুন হন ছাত্রলীগকর্মীদের হাতে। এ ব্যাপারে গ্রেফতার হন ছাত্রলীগ ওসমানী মেডিক্যাল শাখার সভাপতি সৌমেন দে, যিনি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন এবং তাকে মেডিক্যাল কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বছর খানেক জেল খেটে তিনি বেরিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, সৌমেন ওই মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক হতে পারেন, পরে পুরোপুরি ডাক্তারও হয়ে যান। আবু বকরের হত্যাকারীদেরও কোনও শাস্তি হয়নি!

সর্বশেষ ২০১৫ সালে ছাত্রলীগ নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখাটা সম্ভবত আজও প্রাসঙ্গিক। তাই লেখার শেষ অংশটা তুলে দিয়ে বিদায় নেই।

বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, সরকার যখন নিজেদের ডিজিটাল ঘোষণা করছে তখন ছাত্রলীগ মারামারি করছে পুরনো পিস্তল আর চকচকে রামদা দিয়ে। গত ত্রিশ বছরে কোনও ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিতে কোনও স্বপ্ন পাওয়া যায়নি। কেউ বলেনি মহাশূন্যে রকেট, নিদেন পক্ষে স্যাটেলাইট পাঠাতে হবে। কেউ বলেনি যুদ্ধ বিমান কিংবা জাহাজ আমরাই কেন তৈরি করি না। কেউ বলছে না আমাদের স্বপ্নগুলো হলো দখল, খুনোখুনি আর টেন্ডারবাজির মাধ্যমে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। আবু বকরের মা যিনি কিনা কখনও মাথায় তেল দেননি, ডিম খাননি, গাছের নারকেল আর মুরগির ডিম বেচে টাকা পাঠাতেন আবু বকরকে, স্বপ্ন ছিল তার আবু বকর একদিন শিক্ষক হবে, সেই মার স্বপ্ন ধূলোয় মিশিয়ে দেয় ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব। বছরের পর বছর আমরা এসব সহ্য করে আসছি।

কবি শামসুর রাহমান আর ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল শিখিয়েছিলেন অভিশাপ দিতে। অভিশাপেও কাজ হয় না আজকাল।

আল্লাহ মহান, দুঃখ লুকিয়ে রাখার, দুঃখ ভোলার আর কোনও উপায় কি আছে? নাকি এরই নাম কপালের লিখন?

লেখক: রম্যলেখক

Facebook Comments