আজ আবদুল কাদের মোল্লা (রহ) চতুর্থ শাহাদাত বার্ষিকী

আজ ১২ ডিসেম্বর আবদুল কাদের মোল্লার চতুর্থ শাহাদাত বাষির্কী। ২০১৩ সালের এই দিনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, মানবাধিকার সংগঠনের অনুরোধ উপেক্ষা করেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়। নানা কারণে শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বজুড়ে একটি আলোচিত এবং ঘটনাবহুল মামলা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলাটি। এ মামলাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনার কারণে বারবার বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হয় মামলাটি। সুপ্রিমকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ করার সুযোগ টুকুও পাননি আবদুল কাদের মোল্লা। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার স্বপ্নের ইসলামী সমাজ গড়ার আন্দোলনকে দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

জন্ম ও বেড়ে উঠা: মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে ঢের সময় লেগে যায়। প্রকৃত আদর্শবান মানুষের পরিচয় এই ঘূর্ণায়মান মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ বিরল। এই প্রকৃত আদর্শবান মানুষেরা তাদের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন, হয়ে যান মানব সভ্যতার ইতিহাসের অমোচনীয় অংশ। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা প্রকৃতপক্ষে মানবসত্ত্বাবান অসংখ্য মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়ে গঠিত এই রকম একজন রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, একটি নাম, একটি ইতিহাস, একজন কিংবদন্তী।

শিশুকাল থেকে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা অসাধারণ মেধাবী ছাত্র হিসেবে গ্রামে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৫৯ সালে প্রাথমিক বৃত্তি এবং ১৯৬১ সালে মাধ্যমিক শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিস্টিটিউট থেকে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৬৮ সালে একই বিদ্যাপীঠ থেকে বিএসসি পাশ করেন।

১৯৬৯ সালের পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালে তিনি ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। মিষ্টভাষী ও আকর্ষণীয় চারিত্রিক মাধূর্যের অধিকারী হওয়ায় আব্দুল কাদের মোল্লা হয়ে উঠেছিলেন তার সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয়পাত্র। মুক্তিযুদ্ধের কারণে ১৯৭১ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে যান।

২৩ মার্চ, ১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জেসিও মফিজুর রহমানের ডাকে এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং-এ অংশগ্রহণ করেন আব্দুল কাদের মোল্লা। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ এর নবেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মত আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়াতেও ছন্দ পতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই ই আর বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথমশ্রেণী তে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

১৯৮১ সালে সাব-এডিটর পদে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় যোগ দেন আবদুল কাদের মোল্লা। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে সকল পত্রিকা গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছিলো ‘দৈনিক সংগ্রাম’ তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ‘বীক্ষণ’ ও ‘সহজ বচন’ ছদ্মনামে কলাম লিখতেন। তার লেখা আর্টিকেলগুলো সচেতন পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংগ্রাম, সোনার বাংলা, পালাবদল, মাসিক পৃথিবী, কলম ইত্যাদি নানা দৈনিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে তিনি লিখেছেন।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় জাতীয় প্রেস কাবের সদস্য পদ লাভের পাশাপাশি ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দু’বার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবদুল কাদের মোল্লা একজন আপোষহীন সাংবাদিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণ-ভোমরা। সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে এক সময় সাংবাদিকতার পেশাকে বিদায় জানাতে হয় তাকে।

১৯৬৬ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর তাফসীর ‘তাফহীমুল কুরআন’ পড়ে কুরআনের হৃদয়স্পর্শী বাণীতে মুগ্ধ হন এবং ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে ছাত্র সংঘে যোগদান করেন। তিনি পরবর্তীতে ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালে মে মাসে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন হন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর, ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য এবং কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি মনোনীত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর, ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর, ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে ঢাকা মহানগরীর আমীর এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

আন্দোলন সংগ্রাম আবদুল কাদের মোল্লা: এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম তার বিভিন্ন দলের সাথে লিয়াজোঁ করার দক্ষতা প্রকাশ পায়। যদিও তখন এটা ছিল অনানুষ্ঠানিক ও গোপন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে লিয়াজোঁ কমিটি করে বিভিন্ন দলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে দিনের পর দিন তিনি মিটিং করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করতেন ও সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতেন। ১৯৯৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে তিনি গ্রেফতার হন।

আওয়ামী লীগ শাসন আমলে ১৯৯৯ সাল থেকে জামায়াত-বিএনপি লিয়াজোঁ শুরু হয়। চারদলীয় লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। লিয়াজোঁ কমিটিতে বিভিন্ন সময়ে নানা দায়িত্ব পালন করার কারণে বিএনপি দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাসহ উভয় দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণী সভাতে মিলিত হতেন তিনি।

সমাজ সেবায় আবদুল কাদের মোল্লা: জনাব মোল্লা সক্রিয় ভাবে সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। যার মধ্যে সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমি, সদরপুর মাদরাসা ও এতিমখানা, ফরিদপুর জেলার হাজিডাঙ্গি খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানা, সদরপুর আল-আমিন একাডেমি ইত্যাদি অন্যতম। এছাড়া ফরিদপুরের নানা অঞ্চলে মসজিদ তিনি করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের নানা এলাকার ও ফরিদপুরের অসংখ্য দরিদ্র মানুষের তিনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ধনী লোক-জনের কাছ থেকে টাকা এনে এলাকার লোকদের সাহায্য করেছেন। বন্যার সময়ে ফরিদপুর, রাজবাড়ি ইত্যাদি নানা এলাকায় নৌকা করে মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য নিয়ে গিয়েছেন, ওষুধ বিলি করেছেন, স্যালাইন দিয়েছেন, বিশুদ্ধ পানির ট্যাবলেট দিয়েছেন। গরিব শিক্ষার্থীদের মাঝে বই-খাতা বিলি করেছেন। এতিম-মিসকিনদের মাঝে জামা কাপড় দিয়েছেন। জাকাতের টাকা এনে দিয়েছেন। তিনি বাড়ি গেলে গরিব দরিদ্র মানুষের লাইন লেগে যেত। সবাইকে তিনি সাধ্য মতো সাহায্য করেছেন। গরিব মেয়েদের বিয়ে দিতে তিনি সাহায্য করেছেন। নলকূপ করে দিয়েছেন, ব্রিজ- কালভার্ট করেছেন।

কারাবরণ: শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে পাঁচবার কারাবরণ করেন। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথম বারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭১ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন কিন্তু স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কাস্টোডী থেকেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের করেন আব্দুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২শে এপ্রিল থেকে ১৪ই অগাস্ট। প্রায় চারমাস আটক থাকার পরে উচ্চআদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন। সর্বশেষ ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান গেট থেকে গ্রেফতার হন আবদুল কাদের মোল্লা। তবে এবার তিনি আর ছাড়া পাননি।

মামলার ধারাক্রম: ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান গেট থেকে কাদের মোল্লাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগষ্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।

২০১২ সালের ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর

২০১২ সালের ২৫ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ মামলাটি সেখানে স্থানান্তর করা হয়।

২০১২ সালের গত ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগের ঘটনায় চার্জ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

৩ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১২ জন এবং আসামী পক্ষে ছয় জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

২০১৩ সালের ৩১ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ গঠন করা হয় আপিল আবেদন শুনানীর জন্য। ১ এপ্রিল থেকে শুনানী শুরু হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয় কাদের মোল্লাকে। ৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। এরপরই শুরু হয়ে যায় ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি।

মৃত্যুদন্ড কার্যকর: সরকারের নির্দেশে ১০ ডিসেম্বর রাতেই আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের যাবতীয় উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে সরকারের দুইজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সাংবাদিক সম্মেলন করে। কিন্তু ফাঁসি কার্যকরের মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে চেম্বার বিচারপতি ফাঁসি কার্যকর পরদিন সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত স্থগিত করে আদেশ দেন। ১১ডিসেম্বর সকালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে শুরু হয় রিভিউ আবেদনের শুনানি। এ ছাড়া আসামীপক্ষ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোরও আবেদন করে। রিভিউ আবেদন চলবে কি চলবে না এ বিষয়ে ১১ ডিসেম্বর শুনানি শেষে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করায় ফাঁসি স্থগিতাদেশও বহাল থাকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

১২ ডিসেম্বর সকালে আবার শুরু হয় রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি। শুনানি শেষে ১২টা ৭ মিনিটে প্রধান বিচারপতি ঘোষণা করেন আবেদন ডিসমিসড। ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যু কার্যকর করা হয়। মৃত্যু কার্যকর করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার জন্মস্থান সবুজ ছাওয়া ঘেরা ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি ছাড়া পুলিশী প্রহরায় ইসলামী আন্দোলনের এই নেতাকে তার পিতা-মাতার পাশে দাফন করা হয়।

সাজা বাড়ানোর ঘটনা নজিরবিহীন: আবদুল কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এবং বিচার বিভাগের জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়। আপিল বিভাগে আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরপরই সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু এটি একটি ভুল রায়। আমরা এ রায়ে সংক্ষুুব্ধ। আমরা বিস্মিত। আমরা মনে করি- এ রায় ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

বিচারিক আদালত যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেননি সেখানে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মৃত্যুদণ্ড প্রদান বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তা ছাড়া স্কাইপ কেলেঙ্কারির পরও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান আইনের শাসনের পরিপন্থী। আমাদের সমাপনী বক্তব্যে আমরা বলেছিলাম- যে সাক্ষ্য- প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আজ তাকে শুধু দোষী সাব্যস্তই করা হয়নি, মৃত্যুদ-ও দেয়া হয়েছে। বিচারের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক অধ্যায়।

রিভিউর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত আবদুল কাদের মোল্লা: আবদুল কাদের মোল্লা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউর) সুযোগ পাননি। বলা যায় রিভিউর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন শিক্ষা জীবনে মেধার স্বাক্ষর রাখা এই রাজনীতিবিদ। সংক্ষিপ্ত আদেশে তার করা রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্য (মেইনটেনেবল) নয় বলা হলেও পূর্ণাঙ্গ রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) ১৯৭৩ সালের আইনের মামলায় দন্ডিতদের এই সুযোগ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। ৫ ডিসেম্বর তার আপিলের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের প্রেক্ষিতে তিনি আরো ১৫ দিন পর রিভিউ দাখিলের সুযোগ পেতেন। তার আগেই ১২ ডিসেম্বর তার দন্ড কার্যকর হয়েছিল। গত ২৪ নবেম্বর আবদুল কাদের মোল্লার করা রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। ফাঁসি কার্যকর ৩৪৮ দিন পর রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এই রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে রিভিউ নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটে। তার রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে দন্ডিতদের ক্ষেত্রেও আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্য (মেনটেইনেবল) হবে। তবে তা আপিলের সমপর্যায়ের হবে না। ভুল এবং ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই কেবল রায় রিভিউ হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রুলস অনুযায়ী রিভিউয়ের জন্য ৩০ দিন সময় দেয়া হলেও এ আইনে আপিলের রিভিউয়ের সময় হবে ১৫ দিন। এ রায়ের ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানও রিভিউর সুযোগ অবারিত হয়। শুধু তাই নয় আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে সকল দন্ডিতরা রিভিউর সুযোগ পেতে যাচ্ছেন।

আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগের রায়ের পর থেকেই রিভিউ করা যাবেনা বা সুযোগ নেই বলে সরকারের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মত দিয়েছিলেন। ডিফেন্সপক্ষ রিভিউকে সাংবিধানিক অধিকার উল্লেখ করে আসছিল।

২৪ নবেম্বর প্রকাশিত রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা)। তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

আবদুল কাদের মোল্লার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, বর্তমান কর্তৃত্ববাদী জালেম সরকার ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে বিচারের নামে প্রহসন করে হত্যা করেছে। যেভাবে তার বিচার করা হয়েছে তা দেশে-বিদেশে সর্বত্রই বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ঐ বিচার কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি।

গতকাল দেয়া বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা তাকে ফাঁসি দেয়ার পূর্বে বলে গিয়েছেন যে, ‘সরকার আমাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিচ্ছে। আমার শরীরের প্রতি ফোটা রক্ত এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ইসলামী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করবে।’ ইসলামী আন্দোলনে তার অবদানের কথা আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং তার শাহাদাত কবুল করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। সেই সাথে তিনি ইসলামী সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন দেখতেন তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি জামায়াতের সকল নেতা-কর্মী, সুধী, সমর্থক ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

Facebook Comments