ট্রাম্পের ঘোষণার পরিণতির দায় আমেরিকা-ইসরাইলের : ইরান

ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের দখলদারিত্বকে মধ্যপ্রাচ্যের সব সঙ্কটের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছে ইরান। তেহরান অভিযোগ করেছে, এই দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যেই জেরুসালেম বা আল-কুদস শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গতরাতে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের এক বৈঠকে এই সংস্থায় নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি গোলামআলী খোশরু এই অভিযোগ করেন। তিনি ট্রাম্পের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।

খোশরু বলেন, আল-কুদস বা বায়তুল মুকাদ্দাস শহরের ওপর ফিলিস্তিনিদের একচ্ছত্র অধিকারকে অস্বীকার করা হলে ফিলিস্তিন পরিস্থিতির অবনতি ছাড়া অন্য কোনো ফল বয়ে আসবে না। আন্তর্জাতিক সমাজ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পরিণতির জন্য আমেরিকা ও ইসরাইলকে দায়ী করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির ব্যাপারে আমেরিকাকে স্ববিরোধী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন। মার্কিন সরকার ইসরাইলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে সব আন্তর্জাতিক আইন ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই ঘোষণার পরপরই এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি প্রকাশ করে ওই ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

বিশ্বের আরো বহু দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে বায়তুল মোকাদ্দাস বা জেরুসালেম শহর দখল করে নেয়।

ট্রাম্পের সমালোচনায় সাবেক মার্কিন কূটনীতিকেরা
ট্রাম্পের জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দানে নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। ১২১ জন এমপির মধ্যে মাত্র দু’জন এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। বুধবার ট্রাম্পের ঘোষণার পরদিন তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন আহ্বান করা হয়। সেই বৈঠকে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ততে মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত, জাতিসঙ্ঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার আছে স্বাধীন রাষ্ট্রের, যার রাজধানী হবে জেরুসালেম। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি।
ইসরাইলের স্বীকৃতি বাতিল দাবি

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি বাতিল করতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি আইন পরিষদ। বৃহস্পতিবার গাজায় এক জরুরি বৈঠকের পর এই দাবিসহ বেশ কিছু প্রস্তাব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে জেরুসালেম আল আকসা কমিটির মুখপাত্র আহমেদ আবু হালাবিয়া বলেন, তাদের রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের জেরুসালেমকে স্বীকৃতি ও দূতাবাস স্থানান্তরের পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইসরাইল অবৈধ দখলের মাধ্যমে জেরুসালেম ও আল আকসা মসজিদকে ইহুদি ভূখণ্ড করার পাঁয়তারা করছে। যুক্তরাষ্ট্রকেও তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি।
যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত মরক্কো

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবৈধ পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে প্রয়োজনে সব কিছু করবে বলে জানিয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো। রাজধানী রাবাতে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের মুখপাত্র মোস্তফা আল খালফি বলেন, তার দেশ এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনা করছে’। একই সাথে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিপক্ব ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মরক্কোর অবস্থান স্পষ্ট, আমরা কখনোই জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মেনে নেবো না।

ইসরাইলে মার্কিন দূতেরা বিরোধী
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের বেশির ভাগেরই সমর্থন নেই। ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ১১ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ৯ জনই জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের অধীনে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইসরাইলে দায়িত্ব পালন করেছেন ড্যানিয়েল কুর্টজার। তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা আবারো একা হয়ে পড়েছি। ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট যে ভূমিকা পালনের কথা বলেন আমরা সেখান থেকে এখন নিজেরাই নিজেদের সরিয়ে ফেলেছি।’

রিচার্ড জোনস ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপের কারণে ইসরাইল ও অঞ্চলটিতে যে প্রাণহানি হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বিল ক্লিনটনের প্রশাসনের অধীনে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালনকারী উইলিয়াম আন্দ্রিয়াস ব্রাউন, ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী উইলিয়াম ক্যাল্ডওয়েল হ্যারপ, ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অ্যাডওয়ার্ড ডিজেরেজিয়ান, রিগ্যান প্রশাসনের অধীনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী থমাস পিকেরিং এবং বুশ ও ওবামা প্রশাসনের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রদূত জেমস কুনিংহামও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেন। – মিডলইস্ট মনিটর

Facebook Comments